মি. গোবার্ট কিছুদিন যাবৎ বেশ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার এই সমস্যা কোন আর্থিক সমস্যা নয়।
মি. গোবার্ট ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্যের মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য। এমন লোকের আর্থিক সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সমস্যা অন্য কিছু। এবং তা খুব সিরিয়াস। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত স্পব ডাক্তাররা মিলেও যার সমাধান করতে পারছেন না।
মি. গোবার্ট প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবারে অদ্ভুত রকের এক স্বপ্ন দেখতে পান। সেই স্বপ্নে তিনি কি দেখতে পান তার সাথে কি ঘটে এসবের কিছুই তার মনে থাকে না। শুধু এতটুকুই মনে থাকে সেই স্বপ্নে তিনি খুব ভয়ঙ্কর কিছু দেখতে পান। ভয়ে তার পুরো শরীর ঘেমে যায়। হার্ট বিট বেড়ে যায়।
আজ নতুন মাসের প্রথম শুক্রবার। আজ রাতে মি. গোবার্ট দুঃস্বপ্নে ডুবে যাবেন। যা নিয়ে তিনি খুবই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তার চিকিৎসকদের একজন তাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, স্যার আপনি একদম-ই ভয় পাবেন না। সময়মত আরাম করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়বেন। আমরা আপনার পাশে আছি।
গোবার্ট মুখ ভার করে বলেছেন, আপনার শুধু কথা দিয়েই পাশে থাকতে পারেন। কাজের কাজ কিছুই করতে পারেন না।
রাত দশটা বাজে। গোবার্টের মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রনা শুরু হয়েছে৷ এটা তার ঘুমাতে যাওয়ার সিগ্যনাল। প্রত্যেক নতুন মাসের প্রথম শুক্রবার তার এই সমস্যা হয়৷ এই সময় তিনি মাথা ব্যাথার জন্য যত রকম ঔষধ-ই খান না কেন, সেটা কোন রকম কাজ করে না। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এই ব্যাথা ক্রমশ বাড়তেই থাকে।
গোবার্টের মাথার যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। তিনি ইশারায় বললেন, আমি ঘুমাতে গেলাম।
পাশে থাকা চিকিৎসকদের প্রায় সবাই তাকে অভয় দিলেন। বললেন, আপনি কোন রকম ভয় পাবেন না স্যার। আপনি নিজেকে রিলাক্স করে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমরা সবাই জেগে আছিন। আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারন নেই৷
অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই গোবার্ট গভীড় ঘুমে তলিয়ে পড়ে। তার স্বপ্ন শুরু হয়ে গেছে।
স্বপ্নে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার কোন মন্ত্রি নন। কোন এক ভিন দেশের বিশাল সাম্রাজ্যের একমাত্র বাদশা। তার পতি পত্তির কোন অভাব নেই৷ তার রাজ্যে কোন ব্যাংকিং সিস্টেম চালু নেই৷ গোবার্ট নিজের অর্থ-সম্পদ, স্বর্ণালঙ্কার সব নিজের কোষাগারেই সংরক্ষণ করেন।
গোবার্টের এই অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণের গোপন কোষাগারটি তার বাড়ির ভেতরে মাটির নিচে বানানো হয়েছে। এই কোষাগারে গোবার্ট ব্যাতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এমনকি ঘরের কোন পরিবারের লোকও নয়।
গোবার্ট যখন খুশি তখন গিয়ে ঐ কোষাগার থেকে ঘুরে আসে।
মাটির নিচে অন্ধকার একটি ঘরে এত বিপুল পরিমান অর্থ-কড়ি, সোনাদান গোবার্টকে যতটা না তুষ্ট করে তার চেয়ে অধিক ভয়ে তটস্থ করে রাখে৷ অথচ তার এই ভয়ের কোন মানে হয় না৷ ঘরের দরজাটি এমন ভাবে বানানো হয়েছে যেখান দিয়ে একবারে শুধুমাত্র একজন ব্যাক্তি-ই প্রবেশ করতে পারবে এবং ভেতরের সেই লোক বাইরে বের হয়ে আসা না পর্যন্ত কেউ আর ভেতরেও প্রবেশ করতে পারবে না৷ দরজাটি এতটাই মজবুত যা কেউ ভাংতেও পারবে না
গোবার্টের এক রক্ষী একবার তাকে বলেছিলো, রাজা মশাই যদি অভয় দিতেন তাহলে একটি কথা বলতাম।
গোবার্ট অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পেও না। বলো..
- আপনি যে একটা মাত্র চাবি দিয়ে দরজার তালাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন ভেতরে প্রবেশের আগ মূহর্তে যদি কখনো ভূল করে আপনার হাতের চাবিটা বাইরে থেকে যায় আর আপনি ভেতরে আটকা পড়ে যান তাহলে আপনাকেতো আর কখনোই আমাদের পক্ষে আর বাইরে বের করা সম্ভব হবে না৷ এমনকি আপনার লাশটাও ভেতরে পচে গলে যাবে।
গোবার্টভাসিয়ে বলেছেন, যেই একটা ভূল আমার জীবন নিয়ে নিতে পারে সেই একটা ভুল আমার দ্বারা কখনোই হবে না। তুমি এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো।বললেই তো আর নিশ্চিত থাকা যায় না। ভুল করা মানুষের এক রকম অভ্যাস। একজন মানুষ ভুল করবে। এটাই স্বাভাবিক। আর পৃথিবীতে অস্বাভাবিক এর চেয়ে স্বাভাবিক ঘটনাই বেশি ঘটে থাকে। এটা পৃথিবীর নিয়ম এবং চিরায়ত প্রথা।
এই চিরায়িত প্রথাতো আর মিথ্যা হওয়ার নয়। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে।
মি.গোবার্ট নিজের নিয়মিত রুটিন মাফিক একদিন সন্ধ্যায় যখন তার কোষাগারে প্রবেশ করলেন, হঠাৎ-ই মনে হলো হায় সর্বনাশ, ঘরের দরজার চাবিটা তার সাথে নেই৷ ভয়ে গোবার্টের ভেতর শুকিয়ে যায়। একবার তার এক বন্ধু তাকে বলেছিলো, কখনো কখনো মানুষ নাকি তার নিজের মৃত্যুকে আগে থেকে দেখতে পায়৷ গোবার্ট তার ঐ বন্ধুকে তখন পাগল বলেছিলো৷ হাসি তামাশা করে বলেছিলো, তুমি একটা পাগল। মানুষ কখনোই তার মৃত্যুকে আগে থেকে দেখতে পায় না৷ শুধু মানুষ কেন, দুনিয়ার কোন প্রাণীর পক্ষেই এই কাজ সম্ভব নয়।
গোবার্টের এখন মনে হচ্ছে তার ঐ বন্ধুর কথাটি ঠিক ছিলো। সে জানে এখন আর কোন রকম চেষ্ঠা করেই এই বন্ধ কোষাগার থেকে তার বাইরে বের হওয়া সম্ভব নয়। গোবার্ট হাউ মাউ করে কাদতে শুরু করে। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া প্রতি ফোটা পানি তাকে নিজের অতীত স্মরণ করিয়ে দেয়৷ সে অনুশোচনার অন্তহীন সাগরে তলয়ে যায়৷ তার নিজের প্রতি নিজের লজ্জা হতে থাকে। ছিঃ কি জুলুমটাই না সে করেছে নিপীড়িত মানুষদের সাথে৷ নিজের অবৈধ ক্ষমতার দাপটে পুরো রাজ্যের প্রজাদের নিজের দাস করে রেখেছে এতদিন যাবৎ। কত অন্যায়, কত জুলুম কত অবিচার সে করেছে তার এই জীবনে৷
যেই বন্ধ কোষাগারে গোবার্ট এখন নিজের মৃত্যুর প্রহর গুনছে সেই বন্ধ ঘরেই কত যে অসহায় মানুষের স্বপ্ন, আশা, বেচে থাকার একমাত্র সম্বল সে ঝুলিয়ে রেখেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
গোবার্ট নিজের দুই হাতে দুই কান শক্ত করে চেপে ধরে। তার মনে হচ্ছে নিপীড়িত সকল মানুষগুলোর কন্ঠ যেন আজ একত্রে মিলিত হয়ে অতি উচ্চ গলায় ভয়ানক হাসি হাসছে। তার এই করুন পরিনতি আর মৃত্যু ভয় সেই উচ্চ আওয়াজকে আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দিন কয়েকের ব্যবধানে এই বন্ধ কোষাগারে মি. গোবার্ট এখন প্রায় মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে পৌছেছে। সে ঠিকমতো ঠোট নাড়াতে পারছে না। দৃষ্টি ঘোলা হয়ে এসেছে। পিপাসায় মনে হচ্ছে কলিজাটা ফেটে গেছে আরো আগেই। তার সারা শরীর কাপছে।
কাপা কাপা শরীরে গোবার্ট একটা স্বর্ণবার হাতে নিয়ে অপর হাতে আঘাত করলো। বার কয়েক এভাবে আঘাত করার পর তার হাতের আঙুল চুইয়ে ফোটা ফোটা রক্ত বের হতে শুরু করে।
সেই রক্ত মাখা আঙুল দিয়ে প্রানপনে লড়াই করে গোবার্ট নিজের কোষাগারের একটা দেয়ালে লিখেছে,
" পৃথিবীর অন্যতম জালিম এবং অত্যাচারী একজন শাষক আজ মারা গেলো শুধু ক্ষুধা আর তৃষ্ণায়।"
মি. গোবার্টের শরীর ভয়ংকর রকমভাবে কাপছে৷ সে ঘুমিয়েছে প্রায় দুই ঘন্টা হয়েছে। দুই ঘন্টা পর তার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়৷ স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলে তার শরীর কাপতে থাকে।
একজন চিকিৎক তার কাপা শরীরে হাত রাখতেই গোবার্ট চোখ মেলে ধড় ফড় করে উঠে বসে। তার শরীর ঘেমে একাকার। হাপাতে হাপাতে গোবার্ট পাগলের মত শুধু বলছে

0 মন্তব্যসমূহ