আমরা প্রথমে জেনেনেই 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞা কী। 'বিশ্বাস' এর অনেকগুলো সংজ্ঞা রয়েছে। এবং প্রতিটি সংজ্ঞাই নিজের জায়গা থেকে সঠিক। যদিও কোনো একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞার ওপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেননি। কিন্তু সবগুলো সংজ্ঞার ভেতরে অবশ্যই সঠিক সংজ্ঞাটি রয়েছে। সবাই যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞার ওপর ঐক্যমত হননি তাই 'বিশ্বাস' এর কোনো সংজ্ঞাই নাই বলাটা যেমন মুর্খতা। তদ্রূপ প্রতিটি সংজ্ঞাই নিজের জায়গা থেকে সঠিক, তাই একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞার রেফারেন্স কোট করে বাকিগুলোকে ভুল বলাটাও মুর্খতা।
যেমন ধরুন, আপনার হাতে একটা টক ফল আছে। এই ফলটাকে কেউ বলছে, লেবু। কেউ বলছে, মালটা। কেউ বলছে, জাম্বুরা। কেউ বলছে জলপাই। আবার কেউ বলছে তেঁতুল। সারা পৃথিবীর সব মানুষ এর বাইরে আর কিছু বলছে না। তাহলে আপনি নির্দ্ধিধায় বলতে পারেন, আপনার হাতের ফলটি অবশ্যই উপরে উল্লেখিত কোনো একটা ক্যাটাগরির হবে।
আমরা 'বিশ্বাস' এর কয়েকটি সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করব। তার আগে 'আবুলকতিপয় ডট কম' এর দেয়া সংজ্ঞাটা নিয়ে আলোচনা করি৷ 'আবুলকতিপয়- গালাগালির মুক্তির আন্দোলন' ওয়েবসাইটে লিখেছে-
"আমার মতে, বিশ্বাস যার অপর নাম ভরসা। যে জায়গায় বা যে মানুষের ওপর ভরসা করতে পারবেন ওখানে আপনি বিশ্বাস এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবেন।"
খুবই নিম্ন মানের একটি সংজ্ঞা এটা। যেমন ধরুন, চোর, ছিনতাইকারী বা ডাকাতের হাতে ভরসা করে আপনার ব্যাগভর্তি টাকা দিবেন না। এবং ভরসা থেকে বিশ্বাসের অস্তিত্বও খুঁজতে যাবেন না। বরং উল্টোটা করবেন। যদি তার ওপর বিশ্বাস জন্মে। তাহলে সেই বিশ্বাসের পর ভরসা করবেন।
এবার উইকিপিডিয়া থেকে 'বিশ্বাস' এর কিছু উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা জেনেনেই __
"বিশ্বাস বলতে সাধারণত পারিপার্শ্বিক বিষয়-বস্তুরাজি ও জগৎ সম্পর্কে কোনো সত্তার স্থায়ী-অস্থায়ী প্রত্যক্ষণকৃত ধারণাগত উপলব্ধি বা জ্ঞান এবং তার নিশ্চয়তার উপর আস্থা বোঝানো হয় । সমাজবিজ্ঞান , মনোবিজ্ঞান , জ্ঞানতত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্বাস শব্দটি বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে খানিকটা আলাদা অর্থ বহন করতে পারে , তাই জ্ঞান , সত্য ইত্যাদির মত বিশ্বাসেরও কোনো একটি সর্বজনসম্মত সংজ্ঞা নেই বলে অনেকের ধারণা ।
কোনো বিষয় সত্য না মিথ্যা তা বিচার করে - সত্য মনে হলে তা "বিশ্বাস করা" অথবা মিথ্যা মনে হলে অবিশ্বাস করা আর মিথ্যা হবার সম্ভাবনা বেশি মনে হলে সন্দেহ করা হয় । বিশ্বাস মানে হতে পারে আস্থা (faith) , ভরসা (trust) । বিশ্বাসের দৃঢ়তা (বিশ্বাস যত বেশি সন্দেহ তত কম) খুব বেশি হলে তাকে বলা যায় ভক্তি বা অন্ধবিশ্বাস । আবার বিশ্বাস মানে হতে পারে আশা (hope) বা আশ্বাস (assurance) বা বিশ্বাস করার ইচ্ছা (willingness to trust) ।
বিশ্বাস হতে পারে কোন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ অনুভূতির সচেতন অনুধাবন; বা কোনো তথ্য (information) বোধগম্য হওয়া এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যাচাই করার পর এই বোধের নিশ্চয়তা সম্বন্ধে প্রত্যয় বা প্রতীতি জন্মালে (সত্য বলে স্থায়ী ধারণা) হলে তাকে জ্ঞান (knowledge) বলা যায়। পর্যবেক্ষণের উপর যুক্তির (ও পূর্বলব্ধ জ্ঞানের) সাহায্যে বিচার (judge) করে কোন বিষয় সত্য বলে সিদ্ধান্ত নিলে তা থেকে নতুন জ্ঞান জন্মায়। এইভাবে মনের মধ্যে উপলব্ধ সত্যগুলিকে জুড়ে যে তত্ত্বের জাল বোনা হতে থাকে তাদের বিষয়বস্তুগুলি সামগ্রিকভাবে হল জ্ঞান আর তাদের গ্রহণযোগ্যতার সচেতন অনুমোদন হল বিশ্বাস। জ্ঞানের বিশেষত্ব হলো শুধু পূর্বের অভিজ্ঞতাই নয় ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ও অজ্ঞাত পরিস্থিতি সম্বন্ধেও এর দ্বারা (induction) ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভব ও সেই ভবিষ্যৎবাণীর সাফল্য বিশ্বাসকে বজায় রাখে। জ্ঞানের গভীরতা, ব্যপ্তি ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাকে প্রয়োগ করে ভালো ফল লাভের সম্ভাবনার উপর নির্ভর করে জ্ঞান ক্ষেত্রবিশেষে বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা(wisdom) বা দূরদৃষ্টি (insight) ইত্যাদি হিসাবে পরিগণিত হতে পারে।
বিশ্বাস হতে পারে একজনের ব্যক্তিগত কষ্ট কল্পনা। যেমন সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা অনেক কিছু দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করে থাকে এবং তার বিরুদ্ধে প্রমাণ দেখালে সেই বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়ে যেতে থাকে। এই ধরনের ভিত্তিহীন বা যুক্তির অতীত বদ্ধমূল অন্ধবিশ্বাসকে বলে ডিলিউসন (delusion)। আবার বিশ্বাস হতে পারে কোন জনতার সম্মিলিত জনমত। যেমন নানা ধরনের ধর্মবিশ্বাস।
বিশ্বাসের সঙ্গে মূল্যবোধ ও ভালোমন্দ বিচারও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কোন কিছুকে ভালো বলে বিশ্বাস না হলে তাকে খারাপ বলেই সন্দেহ হবে। সন্দেহ (বিশ্বাস করার অনিচ্ছা) খুব জোরালো হলে এবং অন্যান্য চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে দিলে তাকে বলে প্যারানইয়া, যার বিশেষণ হল প্যারানয়েড। সিজোফ্রেনিয়ার চারটি প্রধান ধরনের মধ্যে প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া একটি।"
উইকিপিডিয়ার 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞাগুলো পড়ে হয়তো কিছুটা হলেও 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞা আপনি বুঝতে পেরেছেন।
"স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। দর্শন কী বলে।" মূল টপিকে ঢোকার আগে 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞায় নাস্তিকদের জালিয়াতি ও লুকোচুরি দেখে আসি৷ এবং গুরু ও শিষ্যের 'এ কি হলো রে, এবার বুঝি ফেঁসে গেলুম রে' টাইপের বিনোদন উপভোগ করি।
'আবুলকতিপয় ডট কম' এর এক আবুল লিখেছে __ "বিশ্বাস কখনো যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায় না।" আবালগুলা এই সংজ্ঞা কই পাইলো সেটা মঙ্গল গ্রহের কোনো এলিয়েন জানলে জানতেও পারে।
এবার আসুন, এই নাস্তিকনামক বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোর মনীষী মিস্টার মাতুব্বরের দেয়া 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞা দেখে নেই __
"জ্ঞানের সহিত বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক। বরং বলা হইয়া থাকে যে,জ্ঞান মাত্রেই বিশ্বাস।"(সত্যের সন্ধান পৃ ৭)
যেখানে শিষ্যরা 'বিশ্বাস' এর সংজ্ঞায় যুক্তিকে মানতে নারাজ। সেখানে গুরুজি জ্ঞানের সাথে বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক আখ্যা দিলেন।
কী বুঝলেন! আবুলকতিপয় ডট কম মানলে গুরু মাতুব্বর শেষ! আর মাতুব্বর মানলে শিষ্য আবুলকতিপয় ডট কম শেষ!
" স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। দর্শন কী বলে?" এ টপিকের পরবর্তী পর্বগুলো পড়ার আমন্ত্রণ রইলো। খুব শীঘ্রই আসছে ২য় পর্ব।
লেখক, আ. রাজ্জাক।
অ্যাক্টিভ, নাস্তিকতার মূলোৎপাটন।

0 মন্তব্যসমূহ